গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এই নামটির প্রতি বাংলাদেশের সিনেমা-দর্শকদের প্রচন্ড দুর্বলতা রয়েছে। একেতো তার লেখা গান হরহামেশাই শ্রোতা-দর্শকদের কানে বাজে, তার উপর বরাবরই তিনি ছবি বানান বিরাট ক্যানভাসে। নিয়মিত তারকা সমৃদ্ধ, গল্প নির্ভর, ব্যয়বহুল ছবি নির্মাণ করায় তার ছবির প্রতি দর্শকদের অন্য রকম আগ্রহ কাজ করে। তার কাছে দর্শকদের প্রত্যাশা সবসময়ই আকাশছোঁয়া। তাই ভয় ছিল ‘পাষানের প্রেম’ প্রত্যাশা মেটাতে পারবে তো! জয়- আদনান-অপুদের মতো নতুন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুব কমই কাজ করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। আশি ও নব্বই দশকে তার ছবি মানেই যে ছিল রাজ্জাক-শাবানা-আলমগীরের মতো তারকাদের দৌরাত্ব্য। সেখানে ‘পাষানের প্রেম’-এ তারকা বলতে একজন- মৌসুমী। ভয়টা তাই ‘পাষানের প্রেম’-এর সাথে আগাগোড়াই লেপ্টে ছিল। ‘অভিসার’ সিনেমা হলে সোমবার ইভিনিং শো দেখে সেই ভয় কিছুটা কাটলো। আড়াই ঘন্টা হলে বসে থেকে মনে হলো-হাজার হলেও ‘পাষানের প্রেম’-এর পেছনে ছিল তিন দশকের অভিজ্ঞ এক পরিচালকের চোখ। তাই এ যাত্রায় বেঁচেই গেল ছবির নির্মাণ সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। যদিও হলে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা জানান দিচ্ছিল ইমপ্রেস এ ছবি থেকে খুব বেশি লাভের মুখ দেখবেনা। তারপরও যতজন দর্শক হলে ছিলেন তারা ছবিটি উপভোগ করেছেন বলেই মনে হয়েছে। গোটা হল জুড়ে বেশ কয়েকবারই হাসির হররা বয়ে গেছে। আদনান এবং জয়ের অভিনয়ে দর্শকরা দারুণ মজা পেয়েছেন। কমেডি অভিনয়ে সত্যি জুড়ি নেই জয়ের। পুলিশ, বাবুর্চি, শিক্ষক, ড্রাইভার- বহুরূপী সাজে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন জয়। তার অভিনয় ছিল উপভোগ্য। বলতে গেলে ছবির কমেডিয়ান এবং অ্যান্টি-হিরো দু’টি ভূমিকাই সার্থকভবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন জয়। আর নবাগত আদনানের কথাও না বললেই নয়। তার চরিত্রটাও জয়ের মতোই কমেডিধর্মী। নতুন হিসেবে যথেষ্টই ভাল করেছেন আদনান। কিন্তু আদনানের ব্যায়াম-লব্ধ আকর্ষণীয় ফিগার দর্শকদের দেখাতে পরিচালককে বেশ মরিয়া মনে হয়েছে। আদনানের শরীরে তিনি পোশাক-আষাক এক প্রকার রাখতেই চাননি। সুদর্শন আদনানকে একটি-দু’টি দৃশ্যে খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোফের করায়ত্ত থেকে মুক্ত করতে পারতেন পরিচালক। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। অপু বিশ্বাসের চরিত্রের বিন্যাস খুব একটা গোছালো মনে হয়নি। চাকরি করতে এসে অতো সহজে আদনানের প্রেমে পড়ে যাবে অপুর মতো উচ্চ-শিক্ষিত মেয়ে-এটা মেনে নেয়া কঠিন। তার উপরে যদি চাকরিটাই হয় প্রেমের অভিনয় করা। অশিক্ষিত আদনানকে হাজার চেষ্টা করেও ‘এ-বি-সি-ডি’ শেখাতে পারেনা অপু। অথচ সেই আদনানই রাতারাতি বদলে গিয়ে মিশা সওদাগরকে ইংরেজিতে ধমক দেয় কী করে? শহরের রাস্তায় অ্যাকসিডেন্ট করে অমিত হাসানের লাশ নদীতেই বা তলিয়ে যায় কী ভাবে? পরিচালক শহরে নদী পেলেন কোথায়? কাহিনীতে এরকম কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়েছে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার শত শত জনপ্রিয় গানের গীতিকার। অথচ তার নিজের ছবির গান কখনোই শ্রোতাদের তেমন আন্দোলিত করতে পারেনা। ‘পাষানের প্রেম’-এও তাই ঘটেছে। আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘বুকে যারে বেঁধে ছিলাম’ এবং ‘কে বলে জীবনে প্রেম আসে একবার’ ছাড়া আর কোনটাই শোনার যোগ্য নয়।

প্রকাশতি : দৈনিক ইত্তেফাক, শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর ২০০৮.